একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারার উদাহরণ হলো : আন্ডারগ্রাউন্ড এর রাজনীতি। হুট করে করে হারিয়ে যাওয়া, গায়েব হয়ে যাওয়া, আত্নগোপনে থাকা এবং এই ধারাতে কেউ বলি হয়, কেউ হিরো, কেউ ভিলেন; আবার অনেক সময় হিরো vs ভিলেন তৈরি করার জন্য কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বলির পাঁঠা বানানো হয়। সাথে রয়েছে আরো জেল, মানসিক যন্ত্রণা, সংগ্রাম কিংবা মৃত্যু-সবই বিপ্লবী রাজনীতির অংশ। কিছু কিছু গল্প তামিল, কলকাতা কিংবা হিন্দি সিনেমার মতো নাটকীয়; কিংবা আমার অনুমান তারচেয়ে কমবেশি হতে পারে। তবে এসব আন্ডারগ্রাউন্ড এর রাজনীতি ও বিপ্লব তৈরি হয় মুলত : রাষ্ট্র নিরপেক্ষ নয়, রাষ্ট্র শুধু বিশেষ শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার কাঠামো মাত্র ধারনা থেকে এবং রাষ্ট্র ভাঙার আকাঙ্ক্ষা, শোষণ উচ্ছেদের বাসনা থেকে। আর এই রাষ্ট্র ভাঙ্গা, রাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা করা, আদায় নামে যে বিপ্লবগুলো গড়ে উঠে তার শেষ পরিনিতির বহুমাত্রিক ধারনাগুলো আমি তুলে ধরার চেষ্টা করবো:
আন্ডারগ্রাউন্ড ও বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাতৃভূমি, মায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের, অধিকারসহ নানান আবেগী ধারণাকে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন আশ্রয়ে আশ্রীত অন্ধকার ঘটনা। যেটি বিপ্লব আর অপরাধের বাইনারীর সীমারেখাকে অনেককাংশই অস্পষ্ট করে দেয়। যেখানে রাষ্ট্রের চোখে যে অপরাধী, অনুসারীদের চোখে সে-ই ন্যায়ের প্রতীক। অথাৎ এখানে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীরা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী, একইভাবে মার্কসবাদী যুক্তিতে তারা শ্রেণি সংগ্রামের অনিবার্য ফল। খুন, অপহরণ, অবৈধ অর্থ-এসব রাষ্ট্রীয় আইনের ভাষায় অপরাধ। কিন্তু বিপ্লবী যুক্তিতে এগুলো পুঁজিবাদী লুটের পুনর্বণ্টন। এই যুক্তি অবশ্যই বিপ্লবকে নৈতিকতার বৈধতা দেয়, আবার একই সঙ্গে পুঁজিবাদেও জন্ম দিতে পারে।
রাজনীতিতে আদর্শের পাশাপাশি কখনো অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে জনসমবেদনা তৈরি করা হয়, কখনো মানসিক যন্ত্রণা বা জেলজীবনের গল্প প্রচার করে আবেগ উসকে দেওয়া হয়। দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উত্তেজক বক্তৃতা দিতে হয়, আবার কখনো গুজবও ছড়ানো হয়-যাতে মানুষ সচেতন, অভ্যস্ত কিংবা সতর্ক থাকে। আমার এর আগের লেখা "পলিটিক্যালল সেলস এবং মার্কেটিং " লেখাগুলোতে এটিকে পারফরম্যান্স ও এক্টিং নামে বলার চেষ্টা করেছিলাম আমি । তবে এখানে একটু ব্যাতিক্রম হলো : যারা আন্ডারগ্রাউন্ডে রাজনীতিতে থাকে, তাদের নামে থাকে একাধিক মামলা-খুন, অপহরণ, অবৈধ পণ্য পাচারসহ নানা অভিযোগ। এই কার্যক্রম থেকে অর্জিত হাজার কোটি টাকার স্রোতই অনেককে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বাধ্য করে। আবার যারা আত্মগোপনে থাকে, এমনকি তারা জানে কার কাছে কত পরিমাণ অবৈধ অর্থ রয়েছে।
এই বিপ্লবীরা বিশ্বাস করে-এই অবৈধ অর্থ আসলে জনগণের কাছ থেকেই এসেছে, তাই তা জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হওয়া উচিত। কেউ যদি জনগণের কল্যাণ থেকে দূরে থাকে, তাহলে তাকে অপহরণ করা কিংবা রাজনীতির জালের ফাঁদে ফেলে সেই অর্থ আদায় করাকে তারা ন্যায্য মনে করে। এই রাজনৈতিক ফাঁদ হতে পারে নারীর ফাঁদ, ক্ষমতার লোভ কিংবা অর্থের প্রলোভন। রাষ্ট্র দাবি করে: “নিরাপত্তার জন্য হত্যা বৈধ”। বিপ্লবও তাই বলে- “মুক্তির জন্য হত্যা বৈধ”। যেটি আমি শুরুর দিকে বলছিলাম ন্যায়বিচারে কাঠগড়ায় বিপ্লব আর অপরাধের এই দুই বাইনারি অস্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।
তাহলে স্বাভাবিক এখন প্রশ্ন আসতে পারে -এই মোটা অংকের অর্থ দিয়ে তারা কী করে?
এই অর্থ তারা ব্যক্তিগত ভোগে নয়, বরং সংগঠন ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে চায়। যেকোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি কার্যকর উপায় হলো ডোনেশন। এই ডোনেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকে কিছু শর্ত, নীতিমালা ও পলিসি। এর মাধ্যমে নীরবে আদর্শ সেটআপ বা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। আর যেসব সমাজে সংগঠনের কাঠামো নেই, সেখানে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দানচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়। নিজেরাও ডোনেশন দেয়, অন্যদেরও দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এই প্রক্রিয়ায় ভিশন ও মিশন প্রতিষ্ঠিত হয় আড়ালে। তবে বিপুল অঙ্কের অর্থ যদি হঠাৎ ও সরাসরি প্রবাহিত হয়, তাহলে তা ভয়ংকর রূপও নিতে পারে, এই সচেতনতাও তাদের মধ্যে কাজ করে।
প্রতীকী ফটো (এআই)
এমনকি এই আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীরা সেই অর্থ নিজের সন্তানদের দিতে রাজি নয়। তারা বিশ্বাস করে ডারউইনের “Survival of the fittest” তত্ত্বে। তাদের মতে, সহজলভ্য অর্থ মানুষকে দুর্বল করে; জীবনের ধাক্কা ও সংগ্রামই মানুষকে কলাকৌশল শেখায়। বিল গেটসের ভবিষ্যতে ভাবনার উদাহরণ তাদের কাছে এক ধরনে দর্শনের প্রতীক। তাই তারা মনে করে, অর্থ সবসময় নিয়ম, প্রক্রিয়া ও পলিসির ভেতর দিয়ে সমাজে প্রবাহিত হওয়া উচিত, ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার হিসেবে নয়।
এই বিপ্লবীরা সচেতনভাবে জানে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের জটিলতা ও ভয়াবহতা। আর তারা নিজেই জীবনযাপন করে অতি সাধারণভাবে। বাহ্যিক বিলাসকে সাইডে রেখে। প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠাই তাদের কাছে মুখ্য উদ্দেশ্য। যদিও মার্কস কখনো বলেননি যে “উদ্দেশ্য মহৎ হলেই উপায় পবিত্র হয়”। এই গেল বিপ্লবের গুনগান। যদি এবার আমরা একটু অপজিটি বাইনারীকে দেখি:
ইতিহাস কথা বলে হলো : রাষ্ট্র ভাঙার নামে যে বিপ্লব শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যদিও লেনিন এক ধাপ এগিয়ে বলছিলেন " রাষ্ট্র ভাঙতে হলে পাল্টা শক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো দরকার"। তবে তা হতে হবে সাময়িক। তবে এই সাময়িকীর অভাবে থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লব আর রাষ্ট্রের সীমারেখা ভেঙে যেতে পারে।
মাও সেতু বলেছিলেন-
"Political power grows out of the barrel of a gun".
আমাদের উপমহাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিকে মাওয়ের তত্ত্বকে ফ্রেমের আদলের দেখা যায়। আবার অন্যদিকে নকশাল আন্দোলন রাষ্ট্র ভাঙার কথা বলেছিল, কিন্তু অচিরেই তারা নিজেদের ভেতরেই শাসন, বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের কাঠামো তৈরি করে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও ধীরে ধীরে নিজেরাই হয়ে উঠছিলল ছোট রাষ্ট্র। যদি তবে যোগ করে আবারও বলি -
মার্কস কখনো বলেননি যে “উদ্দেশ্য মহৎ হলেই উপায় পবিত্র হয়”।
বিপ্লবীরা ঠিক এই জায়গাতেই এসে চ্যালেন্জের মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্র যেভাবে কর, আইন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে, আন্ডারগ্রাউন্ড শক্তিও ঠিক একই কাজ করে-শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া। ফলে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠতে পারে:-
রাষ্ট্র ভাঙা হলো, নাকি কেবল রাষ্ট্রের মালিক বদলালো?
ডোনেশন, সংগঠন, জনকল্যাণ : এইসব কার্যক্রম আসলে বিকল্প রাষ্ট্র নির্মাণের প্রাথমিক স্তর। যেখানে রাষ্ট্র নেই, সেখানে বিপ্লবী সংগঠন স্কুল চালায়, বিচার করে, চাঁদা বা ডোনেশন তোলে, চর্চা করে বা চর্চা করায়। মাও যাকে বলেছিলেন “Mass Line”-মানুষকে সম্পৃক্ত করে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করা। তবে বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশে প্রতিটি আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলনের শেষ পরিণতি প্রায় একই:
কেউ রাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করে,
কেউ রাষ্ট্রে সাথে মিশে যায়,
কেউ দমন হয়ে ইতিহাসের জিরোতে পরিণত হয়।
কিন্তু কেউই রাষ্ট্রের বাইরে থেকে চিরকাল “শুদ্ধ বিপ্লব” থাকতে পারে না।
যেমন নকশাল: শ্রেণিশত্রু নিধন থেকে গণবিচ্ছিন্নতায় পা দেয় !
নকশাল আন্দোলনের শুরু হয়েছিল স্পষ্ট মার্কসবাদী থিসিসে-
গ্রামভিত্তিক শ্রেণিসংগ্রাম, জমিদার উচ্ছেদ, রাষ্ট্র ভাঙন। কিন্তু খুব দ্রুত “শ্রেণিশত্রু” সংজ্ঞা প্রসারিত হতে থাকে তাদের মধ্যে।
যে কৃষক ভিন্নমত পোষণ করে, সেও শত্রু।
যে শিক্ষক প্রশ্ন তোলে, সেও শত্রু।
নকশালরা জনগণের প্রতিনিধি হতে গিয়ে জনগণ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয় রাষ্ট্র দমন কারণে বিভিন্ন ধরনে আন্দোলন নিজেই নৈতিক বৈধতা হারায়।
অন্যদিকে সর্বহারা শ্রেনির রাজনীতির কাছে:
ভুল মানে শত্রুতা।
প্রশ্ন মানে বিশ্বাসঘাতকতা।
ফলে সর্বহারা শ্রেণিও রাষ্ট্র ধ্বংস করতে গিয়ে ঠিক রাষ্ট্রের মতোই আচরণ করে বসে।
আর জাসদ শুরু করেছিল বিপ্লবী ভাষায়-রাষ্ট্র, সামরিক শাসন, শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কিন্তু একটা সময় তারা দ্রুত বুঝে ফেলে: ক্ষমতা দখল না করলে বিপ্লব টেকে না। ফলে তারা রাষ্ট্রের সাথে মিশে যায়। অথাৎ নৈতিকতার জায়গায় আসে আপস, কৌশল, ক্ষমতার হিসাব।
জাসদ শেষমেশ দেখিয়ে দেয়
সব বিপ্লব বন্দুক দিয়ে শেষ হয় না,
কিছু বিপ্লব শেষ হয় মন্ত্রিত্ব ( পাওয়ার) ভাগাভাগি দিয়ে।
মাওবাদী আন্দোলন: ভারতের মাওবাদীরা মাওয়ের “Protracted People’s War” তত্ত্বে বিশ্বাস করে।
দীর্ঘ সংগ্রাম, গ্রামভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প শাসন।
কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো:-
নৈতিকতা সংবেদনশীলতা ভোঁতা হয়ে যাওয়া। কারণ এটিতে বিপ্লব আর মুক্তি নয়, শাসকে পরিনত হয় ।
মার্কস শ্রেণির কথা বলেছেন,
লেনিন রাষ্ট্র ভাঙার কথা বলেছেন,
মাও সেতু শক্তির বাস্তবতার কথা বলেছেন-
কিন্তু তাদের কেউই বলেননি যে
স্বদেশ আদিবাসী জ্ঞান পুরোপুরি বাতিলযোগ্য।
উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলনগুলো ঠিক এখানেই ব্যর্থ হয়েছে স্বদেশ জ্ঞানকে পাশে রেখে পশ্চিমা আদলের মুল্যবোধ ও রাজনীতি চর্চার করার কারণে ।
তারা ভেবেছে-
স্বদেশ আদিবাসী মুল্যবোধ ও জ্ঞান ছাড়াই মুক্তি সম্ভব।
0 Comments