সোশিয়াল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ফটো
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা নদীতে নামে, আবার কিছু মানুষ আছে যারা নদীতে নামার মানুষ তৈরি করে।এই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষগুলোকে আমরা সচরাচর দেখতে পায় না। তারা শোশিয়াল মিডিয়ায় আসে না, ভাইরাল হয় না, কিংবা সংবাদপত্রে তাদের নাম ছাপানো হয় না। কিন্তু জলপরীর বানানো জন্য মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, লোভ, ভয় এবং দুর্বলতার সবই তাদের জানা আছে, কিংবা এটা নিয়ে তারা পড়ে থাকবেই, থাকবেই। তারা জানে কোন মানুষকে কোন পথে হাঁটানো যাবে, কোন দরজা খুললে সে এগিয়ে আসবে, আর কোন ক্ষুধার সামনে একটি প্রলোভন রাখলে, দেখাইলে সে নিজের পুরোনো জীবন থেকে সরে যাবে। কীভাবে অসহায় চক্রে ফলে কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, তারা ভালই জানে।
যারা এই জলপরী বানায় কিংবা নারীকে হোটেলে পাঠানো উপযোগী করে অথবা বিদেশে পাচার করে তাদের অনেকগুলো উদ্দেশ্যর মধ্যে একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হলো: প্রথমে মানুষকে বিচার করবে না; তারা মানুষকে বিশ্লেষণ শুরু করে দেয়।
কারো চাকরি দরকার।কারো অর্থ দরকার।কারো পরিচিতি দরকার।কারো সামাজিক স্বীকৃতি দরকার।কারো দরকার বিলাসী জীবনের এক ঝলক। তারা শুধু ভালোই করেই জানে তা না, , স্মার্ট ও চৌকসভাবে জানে: মানুষের স্বপ্নই মানুষের সবচেয়ে কোমলতার জায়গা বলে।
ফলে ওভাবে হিসাবনিকাশ কষিয়ে শুরু করে দেয় নানান আয়োজন ও প্রস্তুতি। একদিনে নয়।এক মাসে নয়।কখনো কখনো বছরের পর বছর ধরে তারা এটি চর্চা করে থাকে।
প্রথমে গুড রিলেশনশিপ ।তারপর আস্থা।তারপর সুযোগ।
এরপর ধীরে ধীরে মানুষটিকে এমন এক জগৎ দেখানো হয়, যা সে আগে কখনো দেখেনি। অভিজাত হোটেলের খাবার, প্রাইভেট গাড়ির আরাম, ফ্লাইট টিকেট, প্রভাবশালী মানুষের সান্নিধ্য, দামি পোশাক, বিদেশ ভ্রমণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশংসা, সব মিলিয়ে একটি নতুন জীবন তাকে স্পেশাল ফিল করায় ।
এবং তখনই জন্ম নিতে শুরু করে আমাদের "জলপরীরা"।
জলপরীরা আসলে সবসময় ভাল মানুষ ছিল, যে একসময় তীরে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত, কিংবা পাহাড় ঝিরি চষে বেড়াত, কিন্তু খুব বেশী সে জানত না এই বানিজ্য নদীর পার্কের গভীরতা কত। জানত না স্রোত কোথায় নিয়ে যাবে। কিন্তু তাকে বারবার বলা হলো: "তুমি আলাদা", "তুমি বিশেষ", "তুমি আরও অনেক কিছু পাওয়ার যোগ্য"।
একসময় সে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
নৃবিজ্ঞান আমাদেরকে শেখায়, মানুষ কেবল অর্থনৈতিক প্রাণী নয়; মানুষ প্রতীক, মর্যাদা ও স্বীকৃতিরও প্রাণী। তাই অনেক মানুষ অর্থের জন্য নয়, বরং স্বপ্নের সামাজিক স্বীকৃতির জন্যও ঝুঁকি নেয়। ক্ষমতাবান কাঠামো ঠিক এই জায়গাটিকেই ব্যবহার করে।
আর মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় " ধীরে ধীরে নির্মিত প্রভাবের এক প্রক্রিয়া। এখানে কাউকে জোর করা হয় না। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষ নিজেই মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের বীজ বহু আগেই তার মনে রোপণ করা হয়েছিল।
আমিও আবারও বলার চেষ্টা করে যাচ্ছি : জলপরীরাও সবসময় খারাপ মানুষ নয়।
অনেকেই আসে দারিদ্র্য থেকে।অনেকেই আসে বঞ্চনা থেকে।অনেকেই আসে এমন পরিবার থেকে, যেখানে স্বপ্ন দেখার সুযোগ ছিল না।
তারা উড়তে চেয়েছিল।তারা সম্মান চেয়েছিল।তারা একটি ভালো জীবন চেয়েছিল।
কিন্তু ধরতে পারে নি তারা : স্বপ্নের বাজারে সব বিক্রেতা সৎ নয়।
কিছু ব্যবসায়ী মানুষের শ্রম কেনে।কিছু ব্যবসায়ী মানুষের মেধা কেনে।আর কিছু ব্যবসায়ী মানুষের সৌন্দর্য, আবেগ, ব্যক্তিত্ব এবং অস্তিত্বকেই পণ্য বানিয়ে ফেলে।
তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না; সে হয়ে যায় একটি প্রদর্শনী, একটি ব্র্যান্ড, একটি ব্যবহারযোগ্য সম্পদ কিংবা ভোগপন্য পাবলিক ফিগার।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যারা এই রূপান্তরের কারিগর, তারা প্রায়ই আড়ালে থাকে। সমালোচনা আসে সেই মানুষটির দিকে, যাকে সামনে দেখা যায়। কিন্তু যিনি বছরের পর বছর ধরে তাকে প্রস্তুত করেছেন, তার দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেছেন, তার সামনে প্রলোভনের দরজা খুলেছেন, তাকে ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় অভ্যস্ত করেছেন: সেই কারিগরের নাম খুব কম মানুষই জানে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষের শরীরের চেয়ে তার মন দখল করা বেশি লাভজনক।
নিকট অতীতের সভ্যতার গল্পও একই কথা বলে : মানুষ সবসময় শক্তির কাছে শিকার হয় না, মাঝে মাঝে ফেঁসে যায় প্রশংসার কাছে; সবসময় হুমকির কাছে নয়, বরং সুযোগের কাছেও হেরে যায় ; সবসময় শত্রুর কাছেও নয়.........()
এই কারণেই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো "আত্মসচেতনতা"।
কারণ নদীতে নামা বিপজ্জনক নয়।বিপজ্জনক হলো, যখন কেউ অদৃশ্যভাবে আপনার জীবনকে এমনভাবে প্রস্তুত করে যে আপনি আর বুঝতেই পারেন না: নদীতে নেমেছেন নিজের ইচ্ছায়, নাকি অন্য কারও নকশা অনুযায়ী।
আর সেই মুহূর্তেই জলপরী জন্ম নেয়।
নদীর জন্য নয়,নদীর মালিকদের জন্য।
তবুও ভালো থাকুক এই জলপরীগুলো।
ধীমান ত্রিপুরা
বি.এস.এস (অনার্স), এম.এস.এস (নৃবিজ্ঞান) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

0 Comments