আমি বেড়ে উঠছি পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত দূর্গম পাহাড়ে। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার: বিদ্যুৎ নামক উপাদানটি ছিল না। আর পড়াশোনাটা শুরু করেছি টেম্পোরারি একটি স্কুলে। যেটি বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি এবং মাটিতে চট বিছিয়ে ক্লাস করতে হয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে এসে তাদের অতীতের প্রাইমারী স্কু লগুলোতে স্মৃতিরোমান্থন করার জন্য নিজ স্কু লটি পরিদর্শন করতে পারলেও কিন্তু আমি পারি না। আমার স্কু লটি আর নেই। শুন্য হয়ে গেছে। কারণ সেটি মাত্র ৫ বছরের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ফলে কাউকে আর আমার প্রাইমারী স্কু লটি (ফজলে হাসান স্যারের ব্র্যাক স্কু ল) দেখানো সম্ভব না। কিংবা আমি এখন নিজে অতীতে ফিরে গিয়ে সেই স্কু লগুলোকে দেখে স্মৃতিরোমান্থন করার আর কোন সুযোগ নেই।
তবুও সেই স্কুলে ছোটবেলায় বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করতে গিয়ে বাঙ্গালীদের ইতিহাস, যুদ্ধ, সংস্কৃতি, উৎসব এর মাঝে "ত্রিপুরা" শব্দটি দেখলে আমার মধ্যে এক অন্যরকম ভাল লাগা অনুভুতি কাজ করতো। মনে হতো আরো, ইস! আমার সম্পর্কে যদি বইয়ের এই দুই পাতায় লেখা থাকতো, তবে কি বইয়ের ওজন বাড়বে!
আমার পোশাক, খাদ্যাভাস, আমার মায়ের ভাষা, আমাদের রাজ- রাজার ও বিভিন্ন রুপকথার গল্প শুধু বাবা মায়ের মুখে শুনতাম। এটি যদি বইয়ে থাকতো, রাখতো। এই ধরনে নানান চিন্তা আমার মধ্যে ঘুরপাক খেতো।কিন্তু আমি যখন ব্র্যাক স্কুলের পাঠদান চুকিয়ে হাই স্কুলের উঠলাম, সেখানে দেখি মারমা ও চাকমা রয়েছে। তাদেরও আমার মতোই একই অবস্থা। বইয়ের পাতায় নিজের সম্পর্কে Read করার সুযোগ নেই। আমি মনে মনে ভাবলাম তারা নিশ্চয়ই খুশী হতো, যদি তাদের নিজ মাতৃভাষা চাকমা, মারমা ভাষা দিয়ে পড়তে পেলে। তারপর আমি রাষ্ট্রের নির্ধারিত বইয়ের দিকে সীমাবদ্ধ না থেকে লাইব্রেরি থেকে বই টেনে পড়া শুরু করে দিই, সেখানে দেখি, কি সুন্দর মনোমুগ্ধকর গল্প, রুপকথার গল্প, আমার ইতিহাস, আমার ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভাস সম্পর্কে লেখা আছে। কিন্তু এটি আমার NCTB বইয়ের সমাজবিজ্ঞান বা ইতিহাসের বইয়ের কোথাও পড়ানো হয় না।
কৃষি শিক্ষা শিক্ষা বই খোললে মনে হতো আমার সম্পর্কে কিছুই লেখা নেই। বৃটিশ পিরিয়ড এর আগে থেকে চাষ করে আসা পাহাড়ি আদিবাসীদের জুমচাষ (যেটি সুইজারল্যান্ড এ শিফটিং কালটিবেশন নামে পরিচিত) সম্পর্কে কিছু লেখা নেই। তাহলে কি আমাদের সবকিছুকে এভাবে Absence করে রেখে দেওয়া হয়েছে।
কলেজে উঠে আমি সংবিধান ধরলাম। দেখি সেখানে আমার সম্পর্কে এক পাতা লেখা নেই। প্রচুর কষ্ট পেলাম। সংবিধান যদি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন হয়, আর সেই মুলনীতি আইনকে রাষ্ট্রের আয়না বলা হয়, তাহলে সেই আয়নায় আমাকে দেখা যাচ্ছে না। সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা জাতি হিসেবে আমি ত্রিপুরা, আমার পোশাক, আমার খাদ্যভাস, আমার মাতৃভাষা সম্পর্কে সবই Absence করে রেখে দিয়েছে। কেউ আমাকে চিনে না। আমি ত্রিপুরা ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষার আবার ৩৬ টি আঞ্চলিক / উপভাষা রয়েছে, সেটি রাষ্ট্রের অনেকে জানে না।
এমনকি University তে পড়াশোনা করতে আসছে একটি ছেলে " নাইমুল ইসলাম " একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করে " তোমরা আদিবাসীরা একটি জাতি! ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা হলো পরস্পরের উপভাষা। তিনি ধরে নিয়েছে আদিবাসী নামে একটি ভাষা একটি জাতি রয়েছে। তার এই প্রশ্নের আমি এতটা আশ্চর্য হয়েছি! তিনি আরো দাবি করলো, বাঙ্গালী একটি জাতি, একটি ভাষা, বাকি নোয়াখালী বরিশাল সিলেট এর বাঙ্গালী ভাষা হলো : উপভাষা / আঞ্চলিক ভাষা। অথাৎ তার মতে, আমরা জাতি হিসেবে পাহাড়ি আদিবাসী, আর পাহাড়ি আদিবাসীদের একটিমাত্র ভাষা, বাকি ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা হলো পরস্পরের আঞ্চলিক বা উপ ভাষা।
তাকে যখন বললাম" আমি জাতি হিসেবে ত্রিপুরা, আবার ত্রিপুরা ভাষার ৩৬ টি আঞ্চলিক বা উপভাষা রয়েছে। এবার তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। যেহেতু এবার তার আশ্চর্য হওয়ার পালা শুরু হয়েছে, তাই আমি আর আশ্চর্য হয় নি। রাষ্ট্র তাকে পড়াশোনা করায়নি বলে অনেককিছু না জেনে সেই ইউনিভার্সিটিতে আসছে বা নিজের থেকে অন্য জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে পড়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে নি।
আমি যখন ঢাকায় ফার্স্ট আছি, ছেলে মেয়েরা আমাকে নিয়ে প্রচুর কৌতুহল। তাদের চেয়ে আমার আরো বেশী কৌতুহল হলো : তারা কেউ কথার শুরুতে আমাকে আদিবাসীর কোন জাতি জিজ্ঞেস করে নি! ফলে আমি ধরে নিলাম এটি রাষ্ট্রের দোষ। রাষ্ট্র তাদেরকে NCTB বইয়ে জাতিগত পরিচয় শেখায়নি। টিভি টকশো চ্যানেলে আমার মাতৃভাষায় কোনকিছু সম্প্রচার করে নি। আমার মাতৃভাষা নামে টিভিতে কোন চ্যানেল নেই। ফলে সেখানে তারা জাতি চিনবে কীভাবে! সেখানে প্রত্যক জাতির নিজস্ব ভাষা পোশাক, খ্যাদ্যাভাস, হস্তশিল্প, বুননশিল্পকে আর কিভাবে আইডেন্টিফাই করতে পারবে তারা।
আমি যখন পর্যটনে দেখি " একজন বাঙ্গালী ছেলে আদিবাসী মেয়ের পোশাক পড়ে ছবি তুলে ফেসবুকে দিতে, বাকি আদিবাসী সবাই বাঙ্গালী ছেলেটিকে হিজরা মনে করে মনের তৃপ্তি মেটালেও, আমি মনে করি ছেলেটিকে রাষ্ট্র অজ্ঞতা রেখে দিয়েছে। কোনটা মেয়েদের পোশাক, কোনটা ছেলেদের পোশাক, কেনটা কোমরের নিচে, কোনটা বুকে পড়তে হয়, এই সেন্স হয়তো তার নেই।
যখন কেউ আদিবাসী কোটার বিরুদ্ধে কথা বলে " তখন আমি বলি বিসিএস প্রশ্নে বাংলার পাশাপাশি ত্রিপুরা মারমা চাকমা ভাষা দিয়ে প্রশ্ন করা চেষ্টা করিও।
আমি দেখালাম! চিকিৎসা সেবাগুলো সেনাবাহিনী দিচ্ছে ডাক্তারের পরিবর্তে, আমি যখন দেখলাম! পুলিশ এর পরিবর্তে সেনাবাহিনী যখন মামলা মকদ্দমাতে খবর নিচ্ছে, আমি দেখলাম যখন! হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে মিলিটারীর পেছনে, অথচ পাহাড়ে পানি নেই, বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বিদ্যুৎ নেই, অথচ বিদুৎ উৎপত্তি হয়েছে পাহাড়ে, সেমুতাং গ্যাস জেগে উঠছে পাহাড়ে, কিন্তু তাদের চুলাতে গ্যাস নেই। তখন আমি বুঝলাম এই রাষ্ট্র আদিবাসী বান্ধব নয়। এই রাষ্ট্র ইতিহাস বান্ধব নই, এই রাষ্ট্র জ্ঞান বান্ধব, পোশাক বান্ধব, খাদ্যাভাস বান্ধব, মাতৃভাষা বান্ধব নই।
আমার চারপাশের বেড়ে উঠা পরিবেশ বলে দিলো, এই রাষ্ট্র গুলি, অস্ত্র, অপহরণ বান্ধব। এই রাষ্ট্র টাকা ও ক্ষমতার বান্ধব। আমি যখন দেখলাম সবাই নির্বাচনে দাঁড়ায় জনগনকে সেবা করার জন্য, কিন্তু দেখলাম টাকা, ক্ষমতা, সমাজের বিচারে কাজ করার জন্য তারা এই পথে। তারা বৈধ প্রকিয়ায় অবৈধ ইনকাম করবে। তারা সমাজের অসংগতি তৈরি ( Artificial crisis) করে জনকল্যাণ মুলক কাজ করে দেখাবে। আমি বুঝলাম এটি সম্পূর্ণ প্রকৃতি বিরোধী। এই প্রকৃতি বিরোধী হওয়ার কারণে ৪৭ হয়, ৫২ হয়, ৭১ হয়, জুলাই বিপ্লব হয়, কিংবা পাহাড়ে আদিবাসীদের ভয়ংকর গেরিলা জেগে উঠে। আমি আরো একটু ভাবলাম, দেখি যে আমার মতো রয়েছে সারাদেশে আরো প্রায় ৫০টি জাতি। যাদেরকে রাষ্ট্র Absence করে রেখে দিয়েছে NCTB বইয়ে, সংবিধানে, অফিস আদালতে। আমি বুঝলাম আমাদের সবার অধিকার এক ও অভিন্ন। আমি একটি নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হলাম : Inclusive যার বাংলা অর্থ: অন্তর্ভুক্তিমুলক। এটি এমন একটি পরিবেশ যেখানে সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে : নারী পুরুষ বৃদ্ধ শিশু ও প্রকৃতি সব শ্রেনি থাকতে পারবে।
একটি ক্লাসরুমের white borad খাটো ব্যাক্তির কথা চিন্তা করে নিচে একটু নামানো হলে, দেখি যে! এটি পরে সবাই ব্যবহার করতে পারে। তখন white borad টি ইনক্লসিভ হয়ে যায়। আমার প্রতিষ্ঠানে সবাই ৫ ফিট ৬ ইঞ্চি। কিন্তু একজন মহিলা আছে ৬ ফিট। দরজা দিয়ে ঢুকতেই তার মাথায় কুঁজো করতে হয়। তার কথা চিন্তা করে দরজাটি আমি একটু লম্বা করলাম, এখন দেখি দরজাটি সবাই ব্যবহার করতে পারে। ফলে এখানে দরজাটি ইনক্লুসিভ হয়ে গেলো। এভাবে ক্লাসরুম, অফিসরুম হতে শুরু করে সংবিধান পর্যন্ত সব জায়গায় ইনক্লুসিভ করতে হবে। এই ইনক্লসিভের কথা বলার কারণে কেউ আমাকে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দেশদ্রোহী, সাজিয়ে গুলি বা অপহরণ করতে পারে। কারণ আমি সকল মানুষ ও প্রকৃতিকে বাঁচতে দেওয়ার কথা বলি।

0 Comments