তারা এলো! “চিকিৎসা সেবা দিবে।” চিকিৎসা নামে নিয়ে গেল আদিবাসীদের শরীরের রক্ত, চোখের ছাপ, হাতের ছাপ সহ নানান নমুনা। তারপর এটা নিয়ে মেডিকেল সাইন্স অনুযায়ী তারা গবেষণা করবে, আদিবাসীদের শরীরে কী কী ধরনের ভাইরাস রয়েছে। যেহেতু আদিবাসীরা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষ, প্রকৃতির ওপর নির্ভর মানুষ, প্রকৃতি; নানান খাবার, কিট-পতঙ্গ, পোকা প্রাণী খাওয়ার কারণে তাদের শরীরে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী এন্টিবডি। যে এন্টিবডির নিউক্লিয়াস এনালাইসিস করে কম্পিউটারে ইনপুট করলে পাওয়া যাবে শত বছরে মানুষ উৎপত্তি ধারাবাহিকতার ডিএনএ-এর নমুনা; যে নমুনাতে রয়েছে হাজার-লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকৃতির প্রাণীর ভাইরাসসহ মানব উৎপত্তির নানান ধারা।
মেডিকেল সাইন্সের গবেষক ও সিনিয়র প্রফেসর ফেলাপা এটি গোপন রাখতে চাইলেন; তিনি বিশ্বাস করেন মানবজাতির কল্যাণে আদিবাসীদেরকে সংরক্ষণ করতে হবে। এটা নিয়ে আজকে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হবে! আলোচনা হবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বাংলোতে।
প্রতীকি ছবি ( এআই থেকে বানিয়ে নেওয়া)
ঠিক ১০টায়, মিলিটারীরা রুমে ঢুকলো; পলিটিশিয়ানরা চেয়ার টেনে বসলো; বুদ্ধিজীবী ও আমলা শ্রেণি বোর্ড-স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রফেসর সাহেব লেকচার দিলেন; প্রকৃতির বিরোধী এমন কোনো কাজ আমাদের করা কখনো ঠিক না। আদিবাসী দমন এর জন্য যে প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ প্রকৃতি-বিরোধী। প্রকৃতি-এর চেয়ে রাষ্ট্র, ধর্ম, মানুষ ; কোনকিছুই বড়ো হতে পারে না। প্রকৃতি ও আদিবাসী বাঁচলে রাষ্ট্র, ধর্ম সব-ই বাঁচবে।
জেনারেল মিলিটারী অফিসার দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি এখন পর্যন্ত আমাদের বাঙালি শরীর থেকে কত ধরনের ভাইরাস পেয়েছেন? আর আদিবাসী শরীরে কত?”
প্রফেসর বললেন: “১০ লক্ষ ভিন্ন গোত্রের ভাইরাস, যা আমাদের বাঙ্গালী শরীরে নেই। আমাদের (বাঙ্গালীর) শরীরে রয়েছে ১ হাজার গোত্রের ২০ লক্ষ কোটি ভাইরাস; আর আদিবাসীদের শরীরে রয়েছে ১০ লক্ষ ভিন্ন গোত্রের ২০ লক্ষ কোটি ভাইরাস।”
জেনারেল বললেন, “তাহলে এখন আপনি ৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ভাইরাস ধ্বংসের ভেক্সিনভেনম বানাতে সমস্যা কোথায়? এই ভেক্সিনভেনমটা আপনি কীভাবে এপ্লাই করবেন, তা একটু শুনি?”
প্রফেসর বললেন, “আমরা তাদের প্রিয় খাবারে: শুকর, নাপ্পি, ব্যাঙ এর উপর এপ্লাই করবো। আমরা এই প্রাণীগুলো চাষ করে তাদেরকে সাপ্লাই দেবো। কিন্তু ঐ সকল প্রাণীও তো এই ভ্যাক্সিন হজম করতে পারবে না, কারণ প্রাণী শরীরে ভাইরাসের সাথে আদিবাসীদের ভাইরাস প্রায় সমগোত্রীয়; এমনকি গাছপালার ভাইরাসও তাদের শরীরে রয়েছে। এই ভ্যাক্সিন তৈরি করলে প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে পৃথিবী বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।”
একজন পলিটিশিয়ান মাইক্রোফোন অন করে বললেন, “জনাব, একজনের শরীরে এত পরিমাণ জীবিত ভাইরাস থাকে! আমাদেরকে আগে একটু ক্লিয়ার করবেন? ১০ লক্ষ ভিন্ন গোত্রের ভাইরাসের সাথে ১ হাজার ভিন্ন গোত্রের ভাইরাসের উপকারিতা এবং অপকারীতা সম্পর্কে ?”
ধন্যবাদ বলে প্রফেসর সাহেব পরবর্তী স্লাইডে গেলেন। তিনি ব্যাখ্যা করলেন সরল ও সহজ ভাষায়— “মানুষ এবং প্রকৃতিকে আলাদা করে অধ্যয়ন করার কোন সুযোগ নেই। বরং মানুষকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে আগামী পৃথিবীতে অধ্যয়ন করতে হবে। এখানে ‘প্রকৃতি’ বলতে গাছপালা, আবহাওয়া, বাতাস, জলবায়ু, জীব, পশু, পাখি, প্রাণী, কিট-পতঙ্গ মানুষ সবাই জড়িত। যেহেতু এগুলো সবই ১১৮টি মৌলিক পদার্থ থেকে সৃষ্টি, ফলে আমরা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের শরীরে পরস্পরের ভাইরাস রয়েছে। ”
প্রফেসরকে থামিয়ে, একজন আমলা প্রশ্ন করলেন: “এত পরস্পরের ওপর নির্ভর হলে আমরা অসুস্থ হয় কেন, অন্যের ভাইরাসের আক্রমণে?”
প্রফেসর বললেন, “ধন্যবাদ, আমি ওই জায়গায় আসছি। শরীরের বিরাজমান একটি ভাইরাসের সাথে আরও একটি ভাইরাস মিলন হয়ে নতুন নতুন ভাইরাস জন্ম হয়; ফলে শরীরের লক্ষ-কোটি ভাইরাস পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে কত পরিমাণ নতুন ভাইরাস জন্ম হতে পারে, একটু অনুমান করুন। ভাইরাসের এই বংশবিস্তার কেবল মানব শরীরে হচ্ছে না। উপরে আমি যে প্রকৃতির কথা বলছি, সেখানে সবার মধ্যে এই বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। আবহাওয়া ছড়িয়ে, খাবারের মধ্যে, বাতাসের মধ্যে, মাংসের মধ্যে, পানির মধ্যেও ছড়িয়ে যায়; সেখানেও বংশবৃদ্ধি চলতে পারে। ফলে কখনোই আমরা পরস্পরের ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে পারবো না। কারণ আমাদের পানি দরকার, বাতাস দরকার, প্রকৃতির নানান খাবার-দাবার দরকার। কারো তেলাপোকা দরকার, কারো ঘাস দরকার, কারো সালোকসংশ্লেষ দরকার, কারো ভাত দরকার, কারো শুকরের মাংস দরকার, কারো চিকেন, রুটি দরকার ইত্যাদি। সবচেয়ে বড়ো কথা, নাক দিয়ে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস দরকার। ফলে এই বংশবৃদ্ধি হওয়া নতুন নতুন ভাইরাস শরীরে হজম করে বেঁচে থাকতে হবে আমাদের সকলে। ”
“আমাদের বাঙ্গালীর শরীরে ১০০০ ভিন্ন গোত্রের ভাইরাস রয়েছে; আবার এটি সকল বাঙ্গালীর শরীরে সমান নয়, কারো এক হাজার, কারো এগারশত, বারশত; অনেক ব্যত্যয় ও হতে পারে। নতুন কোন ভাইরাস আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে; ভিন্ন গোত্রের ভাইরাস তখন বেড়ে যাচ্ছে। যখন হজম হবে না, তখন অসুখ—সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথা, চামড়া চুলকানি এলার্জি সহ সহ নানান সমস্যা দেখা দেয়। তখন অনেকে এই ভাইরাসকে মারার জন্য ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। অপরদিকে রয়েছে আমাদের বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। একটি নতুন ভাইরাসের ওষুধ তৈরি করার জন্য বাজেট, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, স্যাম্পল সংগ্রহ, সময়, এক্সপেরিমেন্ট—প্রায় ৩ মাস থেকে ১/২ বছরও লাগতে পারে। অন্যদিকে প্রতি সেকেন্ড কোটি কোটি নতুন ভাইরাস বংশবিস্তার হয়। ফলে ভাইরাস ধ্বংসের প্রজেক্ট নামা একটি প্রকৃতির বিরোধী কাজ।”
প্রফেসর আরো বললেন, “চীন, আমেরিকা, ইউরোপ- (বায়ো-ওয়েপন্স/জৈবিক অস্ত্র/ভাইরাস অস্ত্রের জন্য) যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, এটি ভয়ংকর পৃথিবীর জন্য। কোন একটি প্রাণী বা কোন একটি জাতিগোষ্ঠীকে মেরে ফেলার জন্য এটি প্রয়োগ করলে তা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়বে। ”
মাথা চুলবিহীন এক বুদ্ধিজীবি প্রশ্ন করলেন, “আমরা জাতির ওপর এপ্লাই না করে ব্যক্তির ওপর এপ্লাই করলে কেমন হবে?”
প্রফেসর বললেন, “চমৎকার প্রশ্ন; এটি করা যায়। আমি একটি উদাহরণ বলি: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কিংবা উত্তর কোরিয়ার কিম উন জং… অন্য দেশে ভ্রমণ করলে নিজেদের বায়ো-চিহৃ (মল-মুত্র) পর্যন্ত ঐ দেশে রাখে না, যাতে করে তাদের শরীরে ভাইরাসের পরিমান, কোন গোত্রের ভাইরাস- এইসব সম্পর্কে কেউ গবেষণা করতে না পারে। ”
প্রফেসর সতর্ক করলেন, “এই প্রক্রিয়ায় আমরা একজনকে মেরে ফেললে, একইভাবে তারাও আরও একজনকে মেরে ফেলার জন্য সেই একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করতে পারে।”
জেনারেল মিলিটারি অফিসার আবারও প্রশ্ন করলেন, “তাহলে গত ২০ বছরে আমরা যে প্রজেক্ট পেছনে হাজার-লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেছি, চিকিৎসা নামে: ব্লাড কালেকশন, ভোটার আইডি কার্ড নামে, চোখের রেটিনা, হাতে ছাপ, কিংবা হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন তথ্য; এই সকল বাজেটের কি হবে?”
প্রফেসর বললেন, “দেখুন! আপনারা এটি মন্ত্রিসভায় আলোচনা করুন; আমি আমার ব্যাখ্যা এক্সপ্লেইন করলাম।”
একজন সিনিয়র মন্ত্রী বলে উঠলেন, “শুধু আদিবাসীদের তালিকা তৈরি করুন, যাদেরকে মারা হবে; এখন অপহরণ, গুলি, সন্ত্রাস সাজানো ও মিডিয়ার সামনে অপারেশন নাটক- পাবলিক আর গ্রহণ করছে না।”
সিনিয়র একজন সাবেক মিলিটারী বলে উঠলেন, “দেখুন, আমাদের প্রজেক্ট হলো জাতিগত নির্মূল অপারেশন; কোনো ব্যক্তি নয়, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা হবে।” প্রফেসর সাহেবের কাছ থেকে ভাইরাসের অপকারীতা পেলেও উপকারী আলোচনাটা এখনও পাইনি।
প্রফেসর বললেন, “আচ্ছা, ধন্যবাদ আপনাকে! আমি আরো একটু ব্যাখ্যা করি। শরীরে ভিন্ন গোত্রের অধিক পরিমাণ ভাইরাস থাকার প্রমাণ করে যে তার শরীরে এডাপটেশন ক্ষমতাটা অনেক স্ট্রং। ফলে ঐ ব্যক্তি বা জাতিগোষ্ঠী বহু ভিন্ন-গোত্রের ভাইরাস ধারণ করার কারণে বহুসংস্কৃতি ও বহুখাদ্যাভাস ও বহুধরনে প্রকৃতির বিষয়গুলো ধারণ করতে পারবে, যা আমাদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। ”
এভাবে অনেকক্ষন আলাপচারিতা পর বসে থাকা সবাই একসাথে বলে উঠলেন “তাহলে সরাসরি মৃত্যু না ঘটিয়ে এমন কিছু ভেনম/ভেক্সিন তৈরি করুন! খাবারের মধ্যে দিলে, কোনো প্রাণীর মধ্যে পুশ করলে কোনো মৃত্যু ঘটবে না, অসুস্থ হবে না; তবে শুধুমাত্র আদিবাসীরা নির্দিষ্ট একটি কাজে পরিশ্রম করবে, বৈচিত্র্য পেশা, আধুনিক ব্যবসা, প্রযুক্তি, মেডিকেল সায়েন্স প্রতি অনাগ্রহ হবে। সাথে ভাইরাসের ভ্যারিয়েশন বিশ্লেষণ করে সংযুক্ত করে দিন; তারা যাতে অলস প্রকৃতি হয়, নিজেদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি দিকে মনোযোগ কম দেয়, সন্ত্রাস দুধর্ষ না হয়, সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হোক’। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে পড়ে যাক, টাকা কামানোর ইচ্ছে কখনই জাগ্রত না হয়, রাষ্ট্র পরিচালনা ইচ্ছে কখনই জাগ্রত না হয়, Unity চেতনা ভেঙে ভ্রাতৃত্ব সংঘাত হয়, কিংবা আমাদের বাজার ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থাকে নিরবে গ্রহণ করে- এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভেনম/ভেক্সিন তৈরি করুন। ” প্রফেসর সাহেব বললেন, “করা যাবে; তবে এই ওষুধটি ধীরে ধীরে কাজ করবে তাদের ওপর, এবং এর মাত্রা কোনোভাবেই বৃদ্ধি করা যাবে না।” ফলে বৈঠকে ওষুধের মাত্রা বৃদ্ধি করা যাবে না- এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা প্রজেক্টটি লঞ্চ করেন ২০২৫ সালের নভেম্বরে..........
(চলবে...)

0 Comments